সাহিত্য পত্রিকা দেখতে এখানে প্রবেশ করুন:
Journal.bangla.du.ac.bd
সাহিত্য পত্রিকা: Journal.bangla.du.ac.bd
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার (১৮৫৭ সাল) ৬৪ বছর পর ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্র, জাতীয়তাবাদ ও বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরেই একটি দেশের আধুনিকায়ন আবর্তিত হয়। এটা কাকতালীয় নয়, ১৮৫৭ সালেই কবি বোদলেয়ার রচিত লে ফ্ল্যর দ্যু মাল কাব্যটির মধ্য দিয়ে প্রত্ন-আধুনিকতার যাত্রা শুরু হয় প্রতীকবাদের মধ্য দিয়ে। রোমান্টিসিজম-রিয়েলিজমের পরপরই ইউরোকেন্দ্রিক আধুনিকতার যে উদ্ভব ঘটে তা আগে-পরের বিস্তৃত সময়গর্ভের মধ্যে লালিত এবং বিশ শতকের বিশের দশকে এসে সেটি কবি টি. এস. এলিয়টের কাব্য ও সাহিত্যচর্চার দ্বারা শীর্ষ-আধুনিকতায় পৌঁছে যায়। রেনেসাঁ-এনলাইটেনমেন্টের দীর্ঘ সাহিত্যচর্চা ও চিন্তাদর্শের সহায়তায় গড়ে ওঠে এই আধুনিকতার উদ্গম ও বিকাশের ঘটনা। আধুনিকতা হচ্ছে একটি ‘ব্রেক’, অতীত থেকে বিচ্ছিন্নতা, বর্তমানতার ওপর নির্ভরশীলতা যা ঐতিহাসিকভাবে দেশে-দেশে নানা রূপে বিকশিত হয়েছে, হয়ে চলছে। ইউরোপীয় হলেও, এটিকে সার্বিক বিষয় বলে ভাবা হলেও, আসলে তা দেশকালভেদে রূপ নিয়েছে স্থানিকতায়। স্থানিকতাই আধুনিকতার চারিত্র্য—যতই এটিকে একটি বিশ্বদর্শন বলে ভাবা হোক না কেন। ব্যাপারটি আরো জঙ্গম ও তীব্রতা লাভ করে উপনিবেশিত দেশগুলোতে। গোটা ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন-শোষণ-সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ আধুনিকায়নের আধুনিক সাহিত্যের চর্চা এবং বাংলাদেশের আধুনিকায়ন প্রক্রিয়াকে খণ্ডিত ও সীমাবদ্ধ করেছে অবধারিতভাবেই। অথবা বলা চলে, আমাদের আধুনিকতা সার্বিকভাবে ভেঙেচুরে স্থানিক হয়ে উঠেছে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যেই—তা যতই গোটা সমাজের অতি ক্ষুদ্র অংশ হোক না কেন—আধুনিকতা বিধৃত, চর্চিত ও রূপান্বিত হয়েছে ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে, বিশেষ করে কলকাতাকেন্দ্রিক পশ্চিমবঙ্গে। জ্ঞানই শক্তি, প্রকৃতি-বিচ্ছিন্নতা, যুক্তিবাদ বা ইউনিভার্সালিজম—এসব সূত্র ঔপনিবেশিক বাংলায় আধুনিকতাকে যতটা ভাবদর্শন হিসেবে নিয়েছে ততটা সমাজভিত্তি রূপে দাঁড় করাতে পারেনি, অন্তত গোটা দেশকে তার আওতায় আনেনি। পূর্ববঙ্গের ক্ষেত্রে তা আরো ন্যূন। বিশেষ করে এখানে ইউরোকেন্দ্রিক আধুনিকতার কলকাতাবাহিত প্রভাবের সঙ্গে সঙ্গে ছিল মধ্যপ্রাচ্যীয় সাহিত্য-সংস্কৃতির উপাদান পরিগ্রহণের জটিলতা। বঙ্গীয় ভূখণ্ডে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সংস্কৃতি ও জীবনায়নে এই জটিলতা নানা রূপে আত্মপ্রকাশ করেছিল। স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে এর নানাবিধ সংকরায়ণ ঘটে, যার ফলস্বরূপ উনিশ শতকের আধুনিকায়নের প্রশ্নে বাঙালি মুসলমান নানা ব্যত্যয় ও প্রত্যয়ের দ্বারা বিভক্ত হয়, তাদের স্বাতন্ত্র্যবাদী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, বা বলা যায় ঝুঁকিতে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর জ্ঞানচর্চা ও সাহিত্যচর্চার যে সূচনা ঘটে তাও কলকাতাকেন্দ্রিক আধুনিকতার চেয়ে ভিন্নধর্মী হয়ে দাঁড়ায় ভৌগোলিক-সাংস্কৃতিক ও জীবনযাপনের পার্থক্যের পরিপ্রেক্ষিতে। এই পার্থক্যই চিহ্নিত করেছেন হুমায়ুন কবির তাঁর বাংলার কাব্য (১৯৪৫) গ্রন্থটিতে। কাজেই পূর্ববঙ্গ আধুনিকতাকে পেয়েছিল অগ্রসর কলকাতার ঔপনিবেশিক আধুনিকতা থেকে, একই সঙ্গে ইউরোপীয় আধুনিকতা থেকে। এই দুই আধুনিকতার মোকাবেলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে ‘আমাদের আধুনিকতা' নির্মাণের প্রয়াস ও পরিচর্যা তাৎপর্য পায় জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক-স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিতকরণের মধ্য দিয়ে, সর্বোপরি ১৯৪৭ সালে দেশভাগের ঐতিহাসিক পটভূমিতে—যার প্রসার ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে ১৯৭১ সালের মুক্তি সংগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত। এই সময়সীমা ও সূত্রের মধ্যে পর্বভিত্তিক একটি চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়া দাঁড় করানো যায়। প্রথম পর্বটি হলো, হিন্দু ও মুসলমান জনগোষ্ঠীর সমন্বয়বাদী ধ্যানধারণা, যার ব্যাপ্তি বিশ শতকের বিশের দশক—যার বহিঃপ্রকাশ ‘নজরুল ও মুসলিম সাহিত্য সমাজ' কেন্দ্রিক। (মোহাম্মদ আজম, ২০২১)। দ্বিতীয় পর্বে বিকশিত হিন্দু মধ্যবিত্ত এবং সদ্য বিকাশোন্মুখ মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে ক্রমে আর্থ-রাজনৈতিক কারণে স্ব স্ব স্বাতন্ত্র্যবাদ দেখা দেয় চিন্তাচর্চায় ও সাহিত্যনীতিতে। আধুনিকতার যে সেক্যুলার বৈশিষ্ট্য তা প্রতিহত হয়ে কতকাংশে ঢাকাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ধর্মীয় আধুনিকতার রূপ নেয়।

This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License.
সাহিত্য পত্রিকা: Journal.bangla.du.ac.bd